হসপিটাল ফার্মেসি কেনো গুরুত্বপূর্ণ?

প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২০ | আপডেট: ৯:২৭:অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২০
ছবি: টিবিটি

প্রাচীন যুগে মানুষ রোগ নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন গাছের লতাপাতা ওষুধ ব্যবহার করতো। তবে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে ওষুধ শিল্পেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বর্তমানে মানুষের চাহিদা পূরণে রাসায়নিকভাবে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন রোগের ওষুধ। আর এই ওষুধ তৈরিতে যাদের সবচেয়ে বেশী অবদান সেই ফার্মাসিস্টরাই পাচ্ছেন না তাদের সেই অবদানের কৃতিত্ব। কিন্তু উন্নত বিশ্বে এই ফার্মাসিস্টদের অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। সেসব দেশের প্রত্যেক এলাকায় মডেল ফার্মেসি রয়েছে যেখানে একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করে ঔষধ বিক্রয় করেন।

একটি দেশের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট এবং নার্সদের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে ফার্মাসিস্টরা ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে ওষুধ সরবরাহ করে থাকেন। আমাদের দেশে ডাক্তার এবং নার্সরা বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করলেও এখনো ফার্মাসিস্টদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়নি। একজন ফার্মাসিস্ট ঔষধ শিল্পে বিভিন্ন ধরণের কাজ করে থাকেন। যেমন গুণগত মান নিশ্চিত করা, গবেষণা করা, উৎপাদন, রফতানি ইত্যাদি। অর্থাৎ ওষুধ শিল্পে আমূল পরিবর্তন হয়েছে এই ফার্মাসিস্টদের হাত ধরেই। কিন্তু দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়োগের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যখাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্ট থাকলে ভুল মাত্রার ওষুধ প্রদানের হার অনেকাংশে হ্রাস পায়। এছাড়া কোন রোগের জন্য কোন ওষুধ প্রয়োজন, ওষুধ কি ডোজ পরিমাণ সেবন করতে হবে, ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, খাবারের সঙ্গে ওষুধের প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো নির্ণয় করে থাকেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও ‘হসপিটাল ফার্মেসি’ চালু রয়েছে। ফলে ওষুধের ক্ষেত্রে তারা আমাদের চেয়ে অধিক সেবা প্রদান করছে।

এছাড়া বর্তমানে মহামারী করোনা ভাইরাসের কালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের যে বেহাল দশা সেটা দৃশ্যমান। মূলত সঠিক পরিকল্পনা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এ খাতের দিন দিন ক্ষতি হচ্ছে। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি কতটুকু সেটা জনগণ প্রত্যক্ষ করছে। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যখাতের আইন প্রণেতারা শুধুমাত্র ডাক্তার, নার্স আর প্যারামেডিকস দিয়েই এই খাত পরিচালনা করতে চান। কিন্তু উন্নত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ফার্মাসিস্টদের বিকল্প নেই। কারণ উন্নত দেশগুলোর হাসপাতাল, ড্রাগ সেন্টার, ফার্মেসি ইত্যাদিগুলোতে উচ্চ বেতনে ফার্মাসিস্ট নিয়োগ হচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যে সুনামের সঙ্গে এদেশের ফার্মাসিস্টরা কাজ করছেন। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্য খাতে এখনো ফার্মাসিস্টরা অবহেলিত।

ফার্মাসিস্টদের নিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বিসিএসআইআর এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ফার্মেসি) আফরিনা আজাদ বলেন, ‘চলমান মহামারি কোভিড-১৯ মোকাবিলায় যদি ডাক্তারবাবুরা প্রথম সারির যোদ্ধা হয়ে থাকেন তাহলে ফার্মাসিস্টরা হলেন যুদ্ধাস্ত্র। হাসপাতাল ফার্মাসিস্ট সবসময়ের জন্যই স্বাস্থ্য-সেবা খাতে অপরিহার্য আর এই বিশ্বমারিতে তারা হতে পারতেন তুরুপের তাস। তাদের অর্জিত জ্ঞানকে ব্যবহার করে ডাক্তারদেরকে কোনো ওষুধ ব্যবহারের যৌক্তিকতা, যৌক্তিক পরিমাণ নির্ধারণ, পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া, বিরূপ প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করে পাশে থাকতে পারতেন। তাই আর সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত হাসপাতাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগ প্রদান করা জরুরি আমাদের সবার স্বার্থেই।’

অনেকটা আক্ষেপ নিয়েই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীমা নাসরিন বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে এখনো এদেশে ফার্মাসিস্টদের কাজের পরিধি অত্যন্ত সীমিত। হাসপাতাল কিংবা কমিউনিটিতে ফার্মাসিস্টদের কাজের ক্ষেত্র এখনো তৈরি হয়ে উঠেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চলমান করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য ফার্মাসিস্টদের নিয়োগের আসলেই বিকল্প নেই। সেজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত দেশের অন্যতম মেধাবী সন্তান ফার্মাসিস্টদের মেধা, প্রজ্ঞা বিবেচনা করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়োগ দেয়া।’

ফার্মাসিস্টদের পরামর্শ অনুসারেই হাসপাতালে একজন নার্স রোগীকে নির্ভুল সেবা দিতে পারে। ভুল নিয়মে ওষুধের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে এবং জনগণের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্ট নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : শারমিন তাসনিম
সাবেক শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।