৪১ বছর পর শেকড়ের সন্ধানে পাবনায় ডেনিশ নাগরিক

টিবিটি টিবিটি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯:৩১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | আপডেট: ৯:৩১:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ডেনিশ নাগরিক মিন্টো কারস্টেন সনিক। ৬ বছর বয়সে পরিবার আর স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার কোনো একটি গ্রামে। ডেনমার্কের এক দম্পতি তাকে দত্তক নিয়ে চলে যান সে দেশে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৪১টি বছর। বর্তমানে তার বয়স ৪৭ বছর। এতদিন পর নিজের শেকড় খুঁজে পেতে এসেছেন বাংলাদেশে। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে শেকড়ের সন্ধানে ঘুরছেন পাবনার পথে পথে।

ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া মিন্টো জানেন না তার বাবা-মা, এমনকি গ্রামের নামও। ছোটবেলার একটি ছবিকে সম্বল করে নিজের পরিবার ফিরে পেতে ঘুরছে। মিন্টোর এই অসম্ভব অভিযান আবেগ তাড়িত করেছে পাবনা বাসীকে।

এই ভিনদেশী মিন্টো ও এনিটি দম্পতি আত্মপরিচয় সন্ধানে পাবনার অলি গলি পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানুষের হাতে লিফলেট দিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করছেন। বহুদিনের পুরোনো এক বালকের (মিন্টোর) ছবি দেখিয়ে খুঁজছেন নিজের পরিচয়।

মিন্টোর বিলি করা লিফলেট থেকে জানা গেছে, ১৯৭৭ সালে ছয় বছর বয়সে পাবনার নগরবাড়ি ঘাটে হারিয়ে যান মিন্টো। সেখান থেকে চৌধুরী কামরুল হোসেন নামের কোন এক ব্যক্তি মিন্টোকে পৌঁছে দেন ঢাকার ঠাটারিবাজারের এক আশ্রমে। ১৯৭৮ সালে ওলে ও বেনফি নামের ডেনিশ দম্পতি দত্তক নিয়ে ডেনমার্ক নিয়ে যান মিন্টোকে।

সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে সস্ত্রীক পাবনায় এসেছেন মিন্টো কারস্টেন সনিক। কিছুদিন আগে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন পাবনার স্বাধীন বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তির সাথে। আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে চলে আসেন বাংলাদেশে। পাবনায় এসে উঠেছেন শহরের একটি হোটেলে।

আলাপকালে মিন্টো সাংবাদিকদের জানান, ছেলেবেলার কোন স্মৃতিই মনে নেই তার, জানেন না বাংলা ভাষা। তবে পেশায় চিত্রশিল্পী মিন্টোর গায়ের রং জানান দেয় তার বাঙালী নৃতাত্ত্বিক পরিচয়। নাটাই ছেঁড়া ঘুড়ির মত জীবনে সব সময়ই তাকে তাড়া করে ফিরেছে বাবা-মায়ের পরিচয় জানার আকুতি। অসম্ভব এই অভিযাত্রায় জয়ী হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবু হাল ছাড়তে নারাজ মিন্টো।

মিন্টো কারস্টেন সনিক জানান, পুরনো কাগজ ঘেঁটে জেনেছেন মাত্র ৬ বছর বয়সে পাবনার বেড়া উপজেলার নগরবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে হারিয়ে যান তিনি। সেখান থেকে ঢাকার ঠাটারিবাজার ‘টেরি ডেস হোমস’ নামের শিশু সদনে ছিলেন। পরে শিশু সদন থেকে ১৯৭৮ সালে ডেনমার্কের এক নিঃসন্তান দম্পতি মিন্টুকে দত্তক নিয়ে যান। ডেনমার্কে শৈশব কৈশোর কাটে, বিত্ত বৈভবের মাঝে লেখাপড়া শিখে বড় হন মিন্টো। পেশায় একজন চিত্র শিল্পী।

ডেনমার্ক নাগরিক ‘এনিটি হোলমিহেভ’ নামের এক চিকিৎসককে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম হয়।

জীবনের শুরুতে তেমন সমস্যার সৃষ্টি না হলেও বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথেই সে সব সময় হীনমন্যতায় ভুগতেন। পরিবারের লোকজনের সাথে খুবই দুর্ব্যবহার করতেন। মাঝে মধ্যেই মেজাজ খিটমিটে হয়ে যেত, কোন কিছুই ভালো লাগতো না তার। অবশেষে পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে ডেনিশ স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ছোট বেলার একটি ছবিকে অবলম্বন করেই ছুটে আসেন পাবনায়। গত দশদিন ধরে পাবনা শহরসহ নগরবাড়ি এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন এই দম্পতি নিজ বাবা-মা কিংবা স্বজনদের খোঁজে। রাস্তায় বের হয়ে মানুষের মাঝে লিফলেট বিতরণ করে জানার চেষ্টা করছেন তার কোনো পরিচয় মেলে কিনা।

সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মিন্টো বলেন, যদিও ডেনমার্কে আমার পালক পিতা-মাতা ও স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে খুব সুখেই আছি। তবুও আমার অন্তর এখনো কেঁদে ওঠে বাংলাদেশের বাবা-মা ও তার স্বজনদের জন্যে। মনে হয় তাদের পেলেই জীবনটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। আমি চোখ বন্ধ করে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলেই, মনে হয় আমার সেই স্বজনদের গন্ধ পাচ্ছি। প্রতিটি মানুষই নিজের বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে চায়।

মিন্টো আরো বলেন, শেকড়ের কথা মনে হলে আমি প্রচণ্ড শূন্যটা অনুভব করি। যদি বাবা-মায়ের খোঁজ পাই তাহলে সেটা অসাধারণ হবে। না পেলে মৃত্যুর আগে জানবো তাদের খুঁজে পেতে আমি চেষ্টা করেছিলাম।

বাংলাদেশে এসে কেমন লাগছে জানতে চাইলে মিন্টো কারস্টেন সনিক বলেন, আমার মনে হচ্ছে যেন ডাঙায় থাকা একটি মাছ পানিতে ফিরেছে। প্রতিটি মানুষকে মনে হচ্ছে আমার আপন, আমার চেহারার সাথে তাদের মিল। যেন আমি আয়নায় নিজেকেই দেখছি।

মিন্টোর আবেগকে শ্রদ্ধা করে তার পরিবারও। আশ্রমে থাকাকালীন ছোটবেলার দু’একটি ছবি ছাড়া কোন সূত্র নেই। এরপরও এক বুক আশা নিয়ে, পাবনার পথে পথে মিন্টোর শেকড় খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মিন্টোর স্ত্রী এনিটি হোলমিহেভ বলেন, মিন্টোর এ দেশে কাটানো শৈশবের কোন স্মৃতিই মনে নেই। যে আশ্রমে সে ছিল তারও অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি আমরা। জানি এটা খুব কঠিন, তারপরও মিন্টো যদি তার স্বজনদের খুঁজে পায়, তবে দারুণ ব্যাপার হবে।

এরই মাঝে সুযোগ সন্ধানী কেউ কেউ নিজেদের মিন্টোর স্বজন বলে দাবী করলেও দিতে পারেনি যুতসই প্রমাণ। ডিএনএ পরীক্ষার কথা শুনে পালিয়ে গেছেন। আত্মপরিচয়ের শেকড় সন্ধানী মিন্টো স্বজনদের দেখা না পেলেও যেন প্রতারিত না হন, জন্মভূমি থেকে সুখস্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারেন প্রশাসনের নিকট সে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী করেছেন স্থানীয়রা। সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে বাবা মাকে খুঁজতে আসা মিন্টোর আবেগ ছুঁয়েছে পাবনাবাসীকেও। প্রশাসন দিয়েছে সহযোগিতার আশ্বাস।

পাবনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শামিমা আকতার বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি, পুলিশের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করার আমরা করছি। ইতিমধ্যেই তিনি পাবনা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন। তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আমাদের পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমগুলোরও মিন্টুর পাশে দাঁড়ানো দরকার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।