The Bangladesh Today | Uniting people everyday

ঢাকা সোমবার, ২৩ মে ২০২২

ভেঙে পড়েছে শাবির শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

ভেঙে পড়েছে শাবির শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
সংগৃহীত

লাগাতার আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো প্রশাসনিক কাঠামোই যেন নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দফতর ও বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অন্তর্দন্দ্ব।

গত ১৭ জানুয়ারি (সোমবার) দুপুর ১২টার মধ্যে শিক্ষার্থীদেরকে আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা সে নির্দেশনা প্রত্যাখান করে হলে অবস্থান নেন। উল্টো তারা শিক্ষকদেরকে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বলেন। ফলে এখন এ অবস্থায় হলগুলোতে প্রভোস্টদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপরও প্রভাব নেই শিক্ষকদের। শিক্ষকদের একাংশ এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবির বিপরীতে অবস্থান নিয়ে আস্থা হারিয়েছেন। তাদের কোনো অনুরোধও এখন আর মানতে চাইছেন না শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের আস্থার জায়গা যেন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

জানা যায়, চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যেও বিভেদ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, সাধারণত এধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলার আগে আমাদের কর্মকর্তা সমিতির মতো একটা সংগঠনের উচিত সবার মতামত নেওয়া।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে,  আমাদের সংগঠনের কয়েকজন নিজেদের মতো করে বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে। আমাদের সবার পরামর্শ নিচ্ছে না। এতে করেও আমরা শিক্ষার্থীদের চক্ষুশূল হচ্ছি। অথচ অনেকেই এই আন্দোলনকে নৈতিকভাবে সমর্থন করছি।

শিক্ষকদের অনেকে চাইছেন শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক বলে মেনে নিতে। কিন্তু তাদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বিভক্তি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, সত্যি বলতে সারারাত ঘুমাতে পারছি না। আমার শিক্ষার্থীরা না খেয়ে আছে। তাদের দিকে তাকাতে পারছি না।

উপাচার্য অবরুদ্ধ হওয়ায় তাকে মুক্ত করতে পুলিশ শিক্ষার্থীদেরকে লাঠিচার্জ করে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ক্যাম্পাসে পুলিশ ডেকে এনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণের কারণেও শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়েছে।

দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে মানববন্ধনে যাওয়া শিক্ষকদের মাঝেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, আমাদের এক সহকর্মী আমাদের অভ্যন্তরীণ ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেন শিক্ষক সমিতির প্রেস ব্রিফিং দেওয়া হবে বলে, তাতে যেন সবাই একসঙ্গে জড়ো হই। কিন্তু যেয়ে দেখি ভিন্ন চিত্র। এছাড়া মানববন্ধনকারী শিক্ষকদের কেউ কেউ বলেন, গণিত বিভাগের এক শিক্ষিকার ভুল আহ্বানে আমরা জড়ো হয়েছিলাম।

বুধবার (১৯ জানুয়ারি) শাবি শিক্ষকদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইনগেটে মানববন্ধন করেন। তারা দাবি করেন, শিক্ষার্থীরা তাদের সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য করেছে।

মানববন্ধনে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লায়লা আশরাফুন বলেন, আমার সন্তান এখন অশুভ করালগ্রাসে। এখন তারা বাবা-মা (শিক্ষক-শিক্ষিকা) সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলে। আমি চাই আমার সন্তান (শিক্ষার্থীরা) আমার কোলে এসে মানুষ হোক।

তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সুবিধাভোগী শ্রেণি না। আমরা সাধারণ শিক্ষকেরা সমগ্র বাংলাদেশের নারী শিক্ষকদের ব্যানারে এখানে দাঁড়িয়েছি। আমরা কোনো চাষাভুষা নই যে যার যা খুশি তা বলবে। আমরা বুদ্ধিজীবি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

এসময় মানববন্ধনরত শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষকরা জাতির বিবেক। আমরা ছাত্রদের গড়ে তুলি। তারা আমাদের সন্তানের মতো। আন্দোলন করতে গিয়ে তারা নারী শিক্ষকদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, স্লোগান দিচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের হেয় প্রতিপন্ন করে কুরুচিপূর্ণ স্ট্যাটাস দিচ্ছে। যেকোন একজন শিক্ষকের জন্য সব শিক্ষকদের নিয়ে তারা এভাবে বলতে পারে না।

তবে শিক্ষকদের এসব দাবি নাকচ করে আন্দোনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা আন্দোলনকারীরা শিক্ষকদের নিয়ে এসব লেখা কোথাও লিখছি না। হতে পারে, তাদের মধ্যে থেকে এসব করা হচ্ছে যাতে আমাদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া যায়। তবে সত্যিই এধরনেরর কাজ কেউ করে থাকলে আমরা আন্দোলনকারীরা তার তীব্র নিন্দা জানাই। সেটি মোটেও আন্দোলনের অংশ নয়।

সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে তিনি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছেন। শিক্ষার্থীরা গত বুধবার (১৭ জানুয়ারি) তার অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার পর তিনি আর অফিসও করতে পারেননি। উপাচার্যের বাসভবন থেকেও প্রকাশ্যে বাইরে আসেননি।

তবে শিক্ষকদেরকে কয়েকবার শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠিয়েছেন আলোচনার জন্য, কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বৃহস্পতিবার (২০ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শাবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে ২০-৩০ জন শিক্ষকের একটি প্রতিনিধি দল আন্দোলনকারীদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন।

এসময় তারা বলেন, আমরা তোমাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। এ ক্যাম্পাসে যাতে আর এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে আমরা সে পরিবেশ নিশ্চিত করব। আমরা এ ব্যাপারে আলোচনা করে সমাধানে যেতে চাই।

এসময় শিক্ষার্থীরা শাবি কোষাধ্যক্ষের আলোচনার বিষয়টিকে প্রত্যাখান করে বলেন, 'স্যার এখন আর আলোচনার কোন পথ খোলা নেই। আমরা যখন আলোচনার জন্য বসে ছিলাম তখন আপনারা আসেন নাই।  

এখন আমাদের একটাই দাবি, যে ভিসি গুলি করার অনুমতি দেন তিনি আর ভিসি থাকার অধিকার রাখেন না। গুলিতে যারা আহত হয়েছে তাদের কেউ মারা যেতে পারতো। ভিসিকে তখন আমরা অ্যাটেম্পট টু মার্ডারের আসামি করতাম। সে হিসেবে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ আর আমাদের ভিসি থাকার অধিকার রাখেন না।'

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, আমরা এখন আর সহমর্মিতা চাই না। আমরা আপনাদের একাত্মতা চাই, স্যার।

প্রসঙ্গত, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা হলের প্রাধ্যক্ষ ও সহকারী প্রাধ্যক্ষদের পদত্যাগসহ, বিভিন্ন অনিয়ম দূর করতে তিনদফা দাবিতে গত ১৩ জানুয়ারি থেকে আন্দোলন করছিলেন ওই হলের ছাত্রীরা। আন্দোলন চলাকালে একপর্যায়ে শনিবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

এ হামলার প্রতিবাদ এবং তিন দফা দাবিতে ফের আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করতে গিয়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বলা হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এর সাথে যোগ হয় উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি।

বুধবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটা হতে উপাচার্যের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরণ এ অনশন কর্মসূচি শুরু হয়। ১৫ জন ছেলে ও ৯ জন মেয়ে সহ মোট ২৪ জন শাবি শিক্ষার্থী অনশনে বসেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ জানুয়ারি) থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আন্দোলনে ৮ জন অসুস্থ হওয়ায় তাদেরকে পাশ্ববর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

এছাড়া, উপাচার্যের বাস ভবনের সামনেই ১৩ জন  অনশনরত শিক্ষার্থীকে ক্যানোলার মাধ্যমে লিকুইড স্যালাইন ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্টারি দেয়া হচ্ছে। প্রায় দুইদিন ধরে না খেয়ে থেকে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।


আরও পড়ুন