The Bangladesh Today | Uniting people everyday

ঢাকা সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১

দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত কবি ও সাহিত্যিক দয়াল ফারুক

দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত কবি ও সাহিত্যিক দয়াল ফারুক
ছবি: প্রতিনিধি

প্রদীপ কুমার দেবনাথ, বেলাব (নরসিংদী): ছড়া, পদ্য, কবিতার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এদেশের মানুষ মুখে মুখে ছড়া বুনে। প্রকৃতি ও মাটির মমতায় এদেশে চারণ কবিরা কবিতা লেখে। নদী খাল বিল ও প্রকৃতির পরশ ছোঁয়ায় বাংলার ছোট্ট জেলা নরসিংদী। নরসিংদী জেলার বেলাবো থানার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা আড়িয়ল খাঁ নদীর পূর্বপাড়ে বীর কান্দা গ্রাম । বীর কান্দা স্কুলের পশ্চিম পাশে চারণ কবি দয়াল ফারুক এর জন্ম। পিতা মরহুম আবুল হাসেম। মা রেজিয়া বেগম। 

হাসেম-রেজিয়া দম্পতির প্রথম সন্তান দয়াল ফারুক। স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি শুরু । আজ চাল নেই চুলা নেই অর্থনৈতিক কষাঘাতে পঙ্গু দয়াল ফারুক করে যাচ্ছেন কবিতার চাষ। স্বভাবজাত কবি দয়াল ফারুকের উচ্চ ডিগ্রির কোন সনদ নেই। কিন্তু উনার ইচ্ছে শক্তি আছে। উনার  লেখায় শব্দ চয়ন, গঠনপ্রণালী, ভাব, বিষয়, উপমা, রূপক, তাল, লয় পাঠকের মনে দাগ কাটে। তিনি শব্দকে ভালোবাসেন কবিতা বুনতে ভালোবাসেন। মৃত্যুর পর্যন্ত লেখতে চান কবিতা। শুধু কবিতা নয়, ছড়া পদ্য, গল্প, উপন্যাস। 

উনার লেখায় যেমন প্রকৃতি, নরনারী, পরম সত্ত্বার প্রেম ফোটে উঠে, তেমনি উনার লেখায় বিদ্রোহের সুর বেজে উঠে। দুর্নীতি, ঘুষ, সুদ, অবিচার, নির্যাতন, শিশু নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠে উনার কলম। উনার লেখা পাঠ করলেই অনুভব করা যায়। অনেক পাঠকই উনাকে এযুগের ' বিদ্রোহী ' কবি বলে ডাকেন। উনার লেখা অসামাজিকতার বিরুদ্ধে, কুশাসনের বিরুদ্ধে, সুদ ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে, দালাল শুয়ারের বিরুদ্ধে, নারী ধর্ষকদের বিরুদ্ধে। যেখানে এই যুগে অনেক লেখকই চাটুকারিতায় লেখালেখি করেন, কবি দয়াল ফারুক তাদের থেকে সম্পুর্ন ভিন্ন। যেখানে অন্যায় সেখানেই চলে কলমের চাষ। 

দয়াল ফারুক নিজেকে ' বিদ্রোহী ' কবি বলতে নারাজ। তিনি নিজেকে বিদ্রোহী কবির উত্তরসূরী বলতে ভালোবাসেন। এত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণায় মাঝে নদীর জলের মতো বয়ে চলে তার কবিতার চাষ। উনার কাব্যগ্রন্থ ' নিঃসঙ্গ ব্যথার খোয়াব ' পাঠ করলেই কবির জাত চেনা যায়। উনি রাষ্ট্র, সমাজ, জনগণকে কি মেসেজ দিচ্ছেন। কবিতাগুলোতে যে দ্রোহ ফুটে উঠেছে, পাঠ করলে শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। নিখুঁত প্রেমের কবিতা পঠনে অনুভব হয় প্রেমের অন্তরেই আছি। এইগুলো আমারই কবিতা।

অতি দুঃখের বিষয়, এদেশে চারণ কবিরা যোগ্য মর্যাদা পায় না, শ্রমের মুল্য পায় না, পরিবেশ পায় না, বাসস্থান পায় না, প্রচার পায় না, তবু আপন ভুবনে কবিতার চাষ করে। ভুলে যায় দুঃখ বেদনা। তাঁরাই এ সমাজের এই দেশের অবহেলিত সন্তান। তাদের দিকে কেউ তাকায় না। তাদের কলম চলে নিভৃত নীরবে। 

তাদের শ্রমের টাকা মেরে খায় এদেশের দালাল শুয়াররা। তাঁরা এদেশে সুবিচার পায় না। মানুষ নামের পশুদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ক্লান্ত তাঁরা। এর বাস্তব উদাহরণ চারণ কবি দয়াল ফারুক। দালাল শুয়ার তার টাকা মেরে খেয়েছে। তিন বছর সমাজের বুকে ঘুরেও সুবিচার পায়নি। শেষ পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দুয়ারে গিয়ে ঝুলে গেছে সুবিচারের বাণী!

গতমাসে তার একমাত্র এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে ছড়াকার ' ফারজানা তৃষা ' বিনা চিকিৎসায় ওপারে চলে গেল। সেও ছড়া কবিতা লেখতো। ফারজানা তৃষার কলম চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে কবির দয়াল ফারুক আজ পাগলপারা। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা 'র সমীপে চারণকবি দয়াল ফারুক এর আরজি — এই বাংলার মাটিতে তিনি কি সুবিচার পাবেন না? উনার ফরিয়াদ কি প্রধানমন্ত্রী দুয়ারে পৌঁছবে? 

কবির কবিতা কি থেমে যাবে? শব্দ ভির করবে না কবির ভুবনে? আজ সংসার বিছিন্ন কবি দয়াল ফারুক। তবু চলছে কবিতার চাষ। 

দয়াল ফারুক এখন একটি মাত্র স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে। তার মৃত মেয়ের নামে একটি পাঠাগার হবে। যে পাঠাগার জ্ঞানের আলো ছড়াবে গ্রামে। প্রতি ঘরে পৌঁছে যাবে বইয়ের আলো। পাঠাগারে পাঠকের কলধ্বণিতে হারানো মেয়েকে খুঁজে পাবে। বই নয়, যেন ফারজানা তৃষাই আছে উনার বুকে। 

যা প্রায় অসম্ভব কল্পনা বলা চলে।  যার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার হবে পাঠাগার? কল্পনা বেশি হয়ে গেল না। 

না কল্পনাটা বেশি নয়।সমাজের সংস্কৃতনা ব্যক্তিরে  যদি চারণকবি দয়াল ফারুকের পাশে দাঁড়ায়, অসম্ভব কে সম্ভব করতে পারি আমরে। প্রয়োজন শুধু যার যার সামর্থ অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। আমরা সবাই একটু সদয় হলে একটি পাঠাগার কেন আরো অনেক কিছুই গড়তে পারি। এটা কবির স্বপ্নই নয়, আমাদের প্রজন্মের আলোঘর হয়ে থাকবে চিরদিন এই বাংলার বুকে।