The Bangladesh Today | Uniting people everyday

ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১

বাণিজ্যিক চাষের বিপুল সম্ভাবনা; লাভও বেশি 

সাতক্ষীরার লোনা পানির ট্যাংরা’র রেণুপোনা উৎপাদনের সাফল্য এখন যশোরে 

সাতক্ষীরার লোনা পানির ট্যাংরা’র রেণুপোনা উৎপাদনের সাফল্য এখন যশোরে 
ছবি: টিবিটি

শহিদ জয়, যশোর ব্যুরো: যশোরে সাতক্ষীরার লোনা পানির ঐতিহ্য ট্যাংরা’র রেণুপোনা উৎপাদনের সাফল্য এখন যশোরের হ্যাচারী পল্লীতে। চাঁচড়ার হ্যাচারী পল্লীতে কৃত্রিম উপায় বা প্রজননের মাধ্যমে হ্যাচারীতে পোনা উৎপাদনের পর পুকুর ঘেরে বা চাষযোগ্য জলাশায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে।

যশোরের কয়েকজন মৎস্য কর্মকর্তা বলছেন, এখন থেকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকহারে এই মাছের চাষ অনেক লাভজনক। চাষীরা লোনা পানি খ্যাত ট্যাংরা চাষে আগ্রহ হয়ে উঠবে বলে মনে করেন মৎষ্য কর্মকর্তারা। এর মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় মাছটিকে যেমন টিকিয়ে রাখা সম্ভব, তেমনি আমিষের ঘাটতি পূরণেও এটি ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে তারা আশা করেন।  

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এর তথ্যমতে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলার সর্ব দক্ষিণাঞ্চলে নদী সাগর ঘের লোনাপানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণ ও দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে, দীর্ঘ বছর বছর এসব উপকূলীয় বা দক্ষিনাঞ্চলের মানুষ। নানা মাছের মধ্যে লোনা ট্যাংরা একটি অন্যতম মাছ। লোনা ট্যাংড়া মাছ অতি প্রিয় বা সুস্বাদু হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এক সময় উপকূলীয় প্রাকৃতিক জলাশয়ে এই মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। কিন্তু নির্বিচারে আহরণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এর প্রাকৃতিক প্রাপ্যতা ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে এই মাছের প্রাপ্যতা হ্রাস পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে এর মূল্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। 

তাই এদের সংরক্ষণ ও সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের খুলনার পাইকগাছাস্থ ‘লোনাপানি কেন্দ্র’ এই মাছের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও আবদ্ধ জলাশয়ে চাষ কৌশল উদ্ভাবনে গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নোনা ট্যাংরা মাছের ব্রুড প্রতিপালন, কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবনে সফলতা অর্জন করেছে। 

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের খুলনার পাইকগাছাস্থ ‘লোনাপানি কেন্দ্র’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কেন্দ্র প্রধান ড. মো. লতিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের মুঠেফোনে জানান, ২০১০ সালের দিকে এই কেন্দ্রে লোনা ট্যাংরা মাছের ব্রুড প্রতিপালন, কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবনে সফলতা অর্জন করে। এই গবেষণায় জাতীয় পুরস্কারও অর্জিত হয়। 

তিনি উলে­খ করেন, প্রাকৃতিকভাবে লোনা ট্যাংরার প্রাপ্যতা এখন ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। আবার এই মাছটি এখন মিঠাপানিতেও চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে এই পোনা উৎপাদন ও চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। 

যশোরে ‘দক্ষিণের লোনাপানির ট্যাংরা’র রেণুপোনা উৎপাদন শুরু করেছেন যশোরের রাষ্ট্রীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত মৎস্যচাষী মো. ফিরোজ খান। তিনি তার মা ফাতিমা ফিস হ্যাচারিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই মাছ চাষের ওপর নানান গবেষণা করে থাকেন। 

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ও মা ফাতিমা ফিস হ্যাচারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফিরোজ খান সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৯ সালে তিনি লোনাপানির ট্যাংরার কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদনের ট্রায়াল শুরু করেন। দু’বছর ট্রায়ালের পর সাফল্য আসায় এ বছর তিনি দেড় কোটি রেনুপোনা উৎপাদন করেছেন। পুকুর, জলাশায় বা। ঘেরের মৎস্যচাষীরা এই পোনা নিয়ে চাষও শুরু করে দিয়েছেন।  

দেশী প্রজাতির এই মাছটি সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে এর উৎপাদন কমে আসছে। এ কারণে তিনি এই মাছটির রেনুপোনা উৎপাদনের ট্রায়াল শুরু করেন। সাফল্য মেলায় এখন সহজেই এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে বাজারে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। 

যশোরে একমাত্র তিনিই এই নোনা ট্যাংরার রেনুপোনা উৎপাদন করছেন উলে­খ করে ফিরোজ খান আরও জানান, লোনাপানির ট্যাংরা এখন খুব সহজেই মিঠাপানিতে চাষ করা সম্ভব। একক চাষে পুকুরে বিঘাপ্রতি ৬০ হাজার ও মিশ্রচাষে বিঘাপ্রতি ৪০ হাজার পোনা চাষ করা যায়। ফিস ফিড দিয়ে মাত্র চার মাস পরই এই মাছ বাজারজাত করা যায়। গড়ে ২৫টিতে কেজি অনুপাতে বাজারমূল্য মেলে ১২-১৫ হাজার টাকা মণ। খুচরা বাজারে ৪শ’-৫শ’ টাকা কেজি। মৃত্যুর হার কম হওয়ায় এই মাছ চাষে যেমন সহজেই সাফল্য অর্জন সম্ভব; তেমনি দেশের বিপুল আমিষের চাহিদার একটি বড় অংশও এই মাছ দিয়ে পূরণ সম্ভব। 

লোনাপানির ট্যাংরা চাষের জন্য ফিরোজ খানের কাছ থেকেই চার লাখ পোনা সংগ্রহ করেছেন যশোর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল। তিনি জানালেন, তার সাত বিঘা পুকুরে এই পোনা ছাড়বেন। মাছ চাষের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকায় তিনি এই মাছ সম্পর্কে জানেন।

ফিরোজ খান কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এই পোনা উৎপাদন করায় তিনি প্রাথমিকভাবে এই চার লাখ পোনা সংগ্রহ করেছেন। চাষে ভালো ফলাফল মিললে তিনি দেড়শ’ বিঘার জলাশয়ে এই মাছ ছাড়ার টার্গেট নিবেন জানা যায়।

জেলা হ্যাচারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম গোলদার বলেন, লোনা ট্যাংরার চাহিদা বাজারে অনেক। তিনি বলেন, যশোর বাগেরহাট সাতক্ষীরা জেলার অনেক শিক্ষিত যুবকেরা এখন বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষে ঝুকে পড়েছে। পাশাপাশি তারা লোনা ট্যাংরার চাষ করছে।

সাংবাদিক ও  মৎসচাষী নুর ইসলাম বলেন, লোনা ট্যাংরা চাষে অনেক ঝুকে পড়েছে। মাছটি অনেক সুস্বাদূ। তিনি ভবিষ্যতে লোনা ট্যাংরার পোনা তার জলাশায় ছাড়বেন বলে জানালেন।কথা হয় যশোর বড় বাজারের মাছ বিক্রেতা আবু হানিফ ও নগেনের সাথে। তারা বলেন, বর্তমানে লোনা ট্যাংরা মৌসুম চলছে। প্রত্যেক কেজি ৫’শত থেকে সাড়ে ৪শত টাকায় বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এই মাছের খদ্দের অনেক। তাছাড়া স্বাদ ও ভালো।     

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান জানান, এই জেলার মৎস্য সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সবসময়ই বিভিন্ন মাছের রেনুপোনা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে লোনাপানির ট্যাংরার রেনুপোনা উৎপাদন খুবই ভাল পদক্ষেপ। এই মাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভবনা সবচাইতে বেশি। লোনাপানির ট্যাংরার পথ ধরে দেশি পাবদা, মাছেরও রেনুপোনা উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করেন।