ব্রাশ করার পর টক খাবার আরো বেশি টক লাগে কেন?

প্রকাশিত: ৭:০৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮ | আপডেট: ৭:১৩:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

সকালটাকে আরো সজীবতা দিয়ে শুরু করতে একগ্লাস কমলার শরবতের তুলনা নেই। কিন্তু আপনি যদি ব্রাশ করার পরপরই এটা পান করেন, তাহলে যেন সকালটাই মাটি হয়ে যায়, প্রচন্ড টকে মুখ যেন ভরে যায়। তাহলে টুথপেস্ট আমাদের জিহ্বায় কি এমন প্রভাব ফেলে যা অরেঞ্জ জ্যুস বা অন্যান্য টক-মিষ্টি খাবারের স্বাদ নষ্ট করে দেয়?

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভাড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক গায় ক্রসবি বলেন, টুথপেস্ট আমাদের মুখ ও জিহ্বার স্বাদগ্রহণকারী অংশসমূহ উপর্যুপরি সিদ্ধ করে ফেলে।এক কথায়, টুথপেস্টে সোডিয়াম লরেল সালফেট (SLS) নামে একটি যৌগ থাকে যা আমাদের স্বাদ গ্রহণ প্রক্রীয়াকে অস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে আমরা ভিন্ন ধরণের খাবারের স্বাদ কেন পাই?

আপনি যদি আপনার জিহ্বায় স্পর্শ করেন, তাহলে দেখবেন যে, এতে প্রচুর ছোটছোট দানার মত রয়েছে। এগুলোতেই আমাদের স্বাদ গ্রহণকারী কোষসমূহ অবস্থান করে। আমাদের মুখের ভেতর ২০০০ থেকে ৪০০০ এর মতো এই দানা রয়েছে এবং প্রতিটি দানায় ১০ থেকে ৫০টি স্বাদ গ্রহণকারী কোষ থাকে। অর্থ্যাৎ বিভিন্ন ধরণের স্বাদ গ্রহণের জন্যে আমাদের মুখ নিপুণভাবে সুগঠিত।

আমাদের জিহ্বার স্বাদ গ্রহণকারী দানাগুলো মূলতঃ পাঁচ ধরণের স্বাদ গ্রহণ করতে পারে, যথাঃ মিষ্টি, লবণাক্ততা, টক, তিতা ও উমামি (বিটকেল ধরণের স্বাদ যা গাজান মাংস বা পনির, মাশরুম প্রভৃতিতে পাওয়া যায়)।

খাবারের স্বাদ গ্রহণ প্রক্রীয়া অনেকটা রাসায়নিক ধাঁধার মতো। আমরা যখন কোন খাবার খাই, সেটার কিছু অংশ থেকে প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট আকৃতির কিছু রাসায়নিক অণু বিস্তৃত হয়ে মুখের ভেতর ভেসে বেড়ায়। প্রতিটি স্বাদের জন্যে পৃথক পৃথক আকৃতির অণু নির্গত হয় এবং এই আকৃতি থেকেই স্বাদ গ্রহণকারী কোষসমূহ স্বাদের ভিন্নতার পরিমাপ করে। যেমন, দুপুরের খাবারে আমরা যদি করলা খাই, তাহলে আমাদের স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলো মস্তিষ্কে কিছু স্নায়বিক সংকেত পাঠায় যে আমরা তিতা কিছু খাচ্ছি।

টুথপেস্ট খাবারের অণু ও  আমাদের মুখের স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। দাঁত ব্রাশ করার সময় সোডিয়াম লরেল সালফেটের কারণে মুখের ভেতর ফেনা তৈরী হয় যেটা দাঁতের ওপর ডিটারজেন্টের কাজ করে। ফ্যোম বা ফেনা তৈরিকারী সব জিনিসেই থাকে সোডিয়াম লরেল সালফেট। এটা এমনকি আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমনঃ শেভিং ফ্যোম, ডিশ ওয়াশের মধ্যেও থাকে। কিন্তু গবেষকদের দাবি, এটা শুধু আমাদের স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলোকেই প্রভাবিত করতে পারে। এটা তিতা বা টক স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলোকে আরো বেশি সংবেদনশীল করে তোলে এবং মিষ্টি স্বাদ গ্রহণের কোষগুলোকে সাময়িক অবচেতন করে দেয়। 

সাইট্রিক এসিডের উপস্থিতির কারণে কমলা লেবু মিষ্টি স্বাদের সাথেসাথে একটু টকও বটে। কিন্তু জ্যুসে চিনি যোগ করা হলে এটা খুব বেশি বোঝা যায় না। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’র তথ্য অনুযায়ী সোডিয়াম লরেল সালফেট শুধু আমাদের মিষ্টি স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলোকে দমিয়েই দেয়না, একইসাথে ফসফোলিপিড নামে একটি যৌগও উৎপন্ন করে যা টক স্বাদ গ্রহণকারী কোষগুলোকে উজ্জিবীত করে। তাই ব্রাশ করার পর কমলার জ্যুস খেলে এটি অনেক বেশি টক মনে হয় যদিও এতে অধিক হারে মিষ্টি স্বাদ থাকে।

সোডিয়াম লরেল সালফেট বিষয়ক সকল গবেষণা এবং স্বাদের উপর তার প্রভাব ১৯৮০ সালে কেমিক্যাল সেন্সেস জার্নালের গবেষণায় পাওয়া যায়। ক্রসবি’র বক্তব্য অনুসারে গবেষণোর লেখকগণ বলেন যে, সোডিয়াম লরেল সালফেট সুক্রোজের(প্রধানত চিনি) মিষ্টতা, সোডিয়াম ক্লোরাইডের(লবণ) লবণাক্ততা, কুইনাইনের(টনিক জাতীয় জলে ব্যবহৃত স্বাদ) তিক্ততা কমিয়ে দেয়; কিন্তু সাইট্রিক এসিডের(লেবু জাতীয় খাবারে পাওয়া যায়) টক স্বাদ বৃদ্ধি করে।  

কিন্তু হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ এই প্রভাব কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যায়। মুখের লালার সাথে এটিও মুখ থেকে সরে যায়। এটি দ্রুত সরাতে আমরা অন্য কিছু খেতে পারি। তাই পরবর্তীতে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করেই অরেঞ্জ জ্যুস না খেয়ে, ব্রাশ করার পর গোসল সেরে আসতে পারেন। তাহলে আপনার মুখের স্বাদ ফিরে আসার সময় পাবে। অবশ্য চাইলে জ্যুস খেয়েও ব্রাশ করতে পারেন।

তথ্যসুত্র: লাইভ সায়েন্স।